••সবুজ বনানী ঘেরা জয়পুর জঙ্গল••
অফিস থেকে তিন - চারদিনের জন্য ছুটি পাওয়া গেছে। বাঙালি এর সতব্যবহার করবে না, তা আবার হয় নাকি? তাই একঘেয়ে সমুদ্র - পাহাড়কে পাশে রেখে বেরিয়ে আসাই যায় কাছেপিঠের কোনো জঙ্গলে। কোথায় যাবো ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে এলো জয়পুর ফরেস্ট কিন্তু আদর্শ জায়গা হতে পারে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। প্রাইভেট কারে চেপে ডানলপ - বালি হয়ে স্টেট হাইওয়ে 'দুই' ধরে প্রথমে হুগলি জেলা পেরিয়ে বাঁকুড়া জেলার পশিমে বিষ্ণুপুরের রাস্তার দিকে যেতেই পরবে জয়পুর ফরেস্ট। প্রায় চার ঘণ্টার রাস্তা পেরোলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে বহু প্রতীক্ষিত জয়পুর ফরেস্টে। তবে বলে রাখা প্রয়োজন এই চার ঘণ্টার রাস্তায় যেতে যেতে পায়ের ক্লান্তি মেটাতে হাত পা ঝেড়ে কামারপুকুর - জয়রামবাটি নেমে পড়তেই পারেন। তবে বুড়ি ছোঁয়া হবে আর কি!
যাই হোক, আবার পথ চলা শুরু। গন্তব্য জয়পুর ফরেস্ট।
মোটামুটি দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেলাম জয়পুর ফরেস্ট। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে আসে। চারদিক সবুজ ঘেরা বনানী। থাকা - খাওয়ার কোনো অসুবিধা নেই। হোটেল - রিসোর্ট এর সুবন্দোবস্ত রয়েছে। ব্যবস্থা রয়েছে গাড়ি রাখারও। জঙ্গল ঘোরার জন্য জঙ্গল প্রেমী হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং জঙ্গল -ই তার প্রেমে পরাতে বাধ্য করবে। রয়েছে অসংখ্য অজস্র ভেষজ উদ্ভিদের গাছ। বিনা বাধায় বেড়ে উঠছে তারা। এছাড়া রয়েছে শাল, সেগুন, মেহগনি, ইউক্যালিপটাসের পাশাপাশি নাম না জানা বহু গাছ। ফরেস্ট অফিস আছে বটে একটা। তবে জঙ্গলের ভিতর নির্দিষ্ট কিছু জায়গা ছেড়ে বাকি জায়গা আপনি ঘুরতেই পারেন। আর কপালের বরাত যদি খোলে, তাহলে তো কথাই নেই, দেখা মিলতে পারে দলমার হাতি। যদিও আরও অন্যান্য বন্য প্রাণীর দেখা মিললেও মিলতে পারে।
সেদিনের ক্লান্তি আর বাধ্য করেনি বাইরে কোথাও ঘুরতে। তবে বাঙালি ঘুরবে না? তা আবার হয় নাকি!
তাই আমরাও বেরিয়ে পরলাম সন্ধ্যে সন্ধ্যে। চা খেয়ে রিসর্টের ভিতর টা ঘুরে রাস্তায় হাঁটা দিলাম। গেলাম পিয়ারডোবা বিমান বন্দরে। সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ বিমান ওঠা নামা করত। রয়েছে বিশাল বড় রানওয়ে। যা অধিকাংশই এখন জঙ্গলের গ্রাসে।
এবার যা দেখলাম তা অপূর্ব। আকাশের দিকে তাকাতেই দেখলাম পরিষ্কার আকাশে ঝলমল করছে এক ঝাঁক তারা। আকাশের এতটুকু জায়গাও কোথাও ফাঁকা নেই। সব তারা যেনো একসাথে জড়ো হয়েছে গল্প গুজব করবে বলে । আর তারই মধ্যে আমাদের চেষ্টা চলছে তারাদের চেনা। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক এখানে সারাদিন শুনতে পাওয়া যায়। সন্ধ্যে বাড়তেই এদের ডাক যেনো আরও তীব্র হয়। কানে তালা লাগার জোগাড় আর কি! ভীতুদের জন্য ভূতের ভয় কিন্তু পিছন ছাড়ছে না।
পরের দিন ঘুম ভাঙলো পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে। বেরিয়ে পরলাম জঙ্গলের পথে। জঙ্গলের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে যে কতটা গভীরে পৌঁছে গেছি, তা আর ঠাওর করতে পারি নি। কম করেও ৭-৮ রকম প্রজাতির কেন্নো, ১০-১২ রকমের প্রজাপতির দেখা পেয়েছি। সবমিলিয়ে জঙ্গল যেনো এক বিস্ময়। সেইদিন হাতে আর বেশি সময় নেই। বেরিয়ে পড়তে হবে বিষ্ণুপুরের পথে। সেইদিনের প্ল্যান ছিল জয়পুর ফরেস্ট থেকে বেরিয়ে বিষ্ণুপুর ঘুরে হাতে সময় পেলে পশ্চিম মেদিনীপুরে গড়বেতার গণগণী-তে যাওয়া হবে।
ব্রেকফাস্ট করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরলাম বিষ্ণুপুরের পথে। সেদিনকার লাঞ্চ বিষ্ণুপুরেই হল। লাঞ্চ সেরে টুকটাক কেনা কাটার পর হাতে বেশ কিছুটা সময় ছিল। এদিকে আবার বেলাও বড়। তাই গণগণী ঘুরেই এলাম।
গণগণী হলো বাংলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। বিশাল বড় বড় লাল পাথুরে পাহাড়ের সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শিলাবতী ওরফে শিলাই নদী । এই শিলাবতীই পরে দ্বারকেশ্বরের সাথে মিশে রূপনারায়ণ হয়েছে। বায়ুর ক্ষয়কার্য যে এত অপূর্ব রূপ দিতে পারে তা গণগণী না গেলে বোঝাই যেত না। এখানে প্রকৃতিই তার আপণ ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছে। বিশাল বিশাল লাল পাথুরে পাহাড়গুলো কোনোটা সিংহ আবার কোনোটা মন্দিরের চূড়া আবার কোনোটা গণেশের মূর্তির চেহারা দিয়েছে।
তৈরি হয়েছে বিশাল সুরঙ্গ পথের। প্রত্যেকটা কোনায় কোনায় রয়েছে রহস্যের গন্ধ। আর সেখানেই সচক্ষে দেখতে পেলাম সাপ আর ব্যাঙের যুদ্ধ। তিনতলা সমান পাহাড় গুলোর একেবারে মাথায় উঠে আবার নিচে নেমে অন্য এক পাথুরে পাহাড়ে যাওয়া, এর একটা আলাদা স্বাদ আছে।
আর সাইড সিন এর কথা তো ছেড়েই দিলাম। সব মিলিয়ে চক্ষু দুটি সার্থক হয়েছে আমার। সেদিনের সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে কয়েক কেজি এনার্জি নিয়ে ফিরেছি।
পরের দিন বাড়ি ফেরার পালা। মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। মনে হয় আরও ক'টা দিন এখানে থেকে গেলে হতো না! কিন্তু আমি তো নিরূপায়। বাড়ি তো ফিরতেই হবে। লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পরলাম জয়পুর ফরেস্ট থেকে।
সবকিছু মিলিয়ে মোটামুটি আনুমানিক খরচ পড়েছে মাথাপিছু ছয় হাজার এর মতন। তবে এক্ষেত্রে ট্রেনে যাত্রা না করলেই ভালো। কারণ, দুরত্ব আর অনেকটা ভাঙা যাত্রা। যেহেতু একটু দুরের রাস্তা তাই অবশ্যই কিছু শুকনো খাবার নিয়ে যেতে হয়। আর চা পানীয় তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
একজন খাদ্য রসিক বাঙালির কাছে উপড়ি পাওয়া টার্কির মাংস, কোয়েলের মাংস, কড়কনাথ মুরগির মাংস, দেশি মাগুরের ঝোল, খাঁটি গরুর দুধের দই, রসগোল্লা. . .
জয়পুর ফরেস্ট কিন্তু নিজের রঙে রঙ্গিনী। সে নিজেই নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে নিজের মতন করে। প্রকৃতির খেলা, রং, রূপ, গন্ধ, কাল্পনিক ভয়ের সৃষ্টি, বহু অপরিচিত গাছের পরিচয় জানার কৌতুহল, এত সব কিছু বিস্ময়ের সাক্ষী থাকতে চাইলে বেরিয়ে পরাই যায় জয়পুর ফরেস্ট।
জয়পুর ফরেস্টের নিজস্ব একটা পরিচয় আছে। আর তাতেই সে খুশি।
_______________
জয়পুর ফরেস্ট।
Comments
Post a Comment